মোহনবাগানে যাঁর হাত দিয়ে শুরু রত্ন প্রদান, আজ সেই অঞ্জন মিত্রই রত্ন সম্মানে ভূষিত
যিনি এই পথটা দেখিয়ে ছিলেন, আজ সেই অঞ্জন মিত্রকেই মোহনবাগানরত্ন দিয়ে বেধহয় কৃতজ্ঞতা জানালো উত্তর প্রজন্ম। সত্যিই বৃত্ত বোধহয় এভাবেই সম্পূর্ণ হয়!

ছবি - সৌজন্য এআইএফএফ
এক্সট্রাটাইম ওয়েব ডেস্ক
সেটা ছিল ২০০১ সাল। সচিব অঞ্জন মিত্রর হাত ধরে একটি দুর্দান্ত ব্যাপার শুরু হল মোহনবাগানে। মোহনবাগানরত্ন প্রদান। ক্লাবে আজীবনের অবদানের জন্য এই সম্মান তুলে দেওয়া হচ্ছে সেই ২০০১ থেকে। প্রথম রত্ন পদ্মশ্রী শৈলেন মান্না। তারপর থেকে একে একে অনেকে। ২০২৫-এ অঞ্জনের অভিন্ন হৃদয়বন্ধু টুটু বোস। আর এই ২০২৬-এ মোহনবাগানরত্ন হচ্ছেন তিনি – সেই অঞ্জন মিত্র। যাঁর হাত দিয়ে শুরু রত্ন প্রদান, আজ সেই তিনিই রত্ন সম্মানে ভূষিত।
রত্ন। নিখাদ রত্ন। মোহনবাগানের ইতিহাসে স্মরণীয় একটা অধ্যায় অঞ্জন মিত্র। টুটু বসু-অঞ্জন মিত্র জুটিতে ক্লাবের ইতিহাসে কতই না কর্মকাণ্ড! একটা আস্ত ইতিহাস।
`৭৫-এর পাঁচ গোল খাওয়া দুই বন্ধু একসঙ্গে গ্যালারিতে বসে দেখেছিলেন। তখনই ঠিক করে নিয়েছিলেন, একদিন তাঁরা হবেন মোহনবাগান ক্লাবের কাণ্ডারি। তারপর ধীরেন দের সংস্পর্শে এসে ক্লাব প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া।
ক্লাব প্রশাসনে দীর্ঘ একটা অধ্যায়, ইতিহাস অঞ্জন জমানা। প্রথমে পাঁচ বছর হিসাবরক্ষক হিসাবে কাজ করা। তারপর দীর্ঘ ২৩ বছর মূল কাণ্ডারি – মোহনবাগানের সচিব।
অঞ্জন জমানায় ক্লাবের একের পর এক কর্মকাণ্ড, ঐতিহাসিক সব সিদ্ধান্ত, যুগান্তকারী কতই না পদক্ষেপ! শুধুমাত্র স্বদেশি খেলোয়াড় খেলানোর রীতি ভেঙে বিদেশি ফুটবলার খেলানোর সিদ্ধান্ত ও কার্যকর হয় টুটু-অঞ্জন জমানাতেই। আধুনিকাতার পথে নিঃসন্দেহে বিরাট এক পদক্ষেপ।
অঞ্জন মিত্র বুঝেছিলেন, শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগে ক্লাবের সমৃদ্ধি হবে না। দরকার স্পনসর। সেটা নিয়ে আসার ক্ষেত্রে মনে রাখার মত ভূমিকা ছিল তাঁর।
ফিফা প্রেসিডেন্ট ব্লাটারকে এনেছিলেন। ক্লাবে নিয়ে এসেছিলেন ফুটবলের রাজপুত্র দিয়েগো মারাদোনাকে। অলিভার কানের বিদায়ী ম্যাচ কলকাতায় করার ক্ষেত্রেও তাঁর ছিল বিরাট ভূমিকা।
টিএফএ-র দ্বিতীয় ব্যাচটাকে ক্লাবে নিয়ে এসে একটা নতুন দিশা দেখিয়ে ছিলেন। অ্যাকাডেমি থেকে সরাসরি ফুটবলার নিয়ে আসার সাহস ও দূরদৃষ্টি ছিল, সেটা করে দেখিয়ে ছিলেন অঞ্জন মিত্র। গড়ে তুলেছিলেন মোহনবাগান সেইল ফুটবল অ্যাকাডেমি। সেটা ছিল তাঁর স্বপ্ন, তাঁর আবেগ, তাঁর প্যাশন। গুরুত্ব দিয়েছিলেন মহিলা সদস্যদের। তাঁর সময়ে মহিলাদের ফুটবল দলও তৈরি হয়েছিল। অঞ্জন জমানাতেই একাধিকবার এসেছিল জাতীয় লিগ, এসেছিল আই লিগ।
অঞ্জন মিত্রর ছিল আর একটি সত্ত্বা। বিপ্লবী সত্ত্বা। অন্যায় দেখলে, অবিচার দেখলেই গর্জে উঠতে পারতেন আপাত নিরীহ, বন্ধুবৎসল ওই মানুষটা। সব সময় প্রতিষ্ঠানকে চ্যালেঞ্জ করার একটা প্রবণতা ছিল তাঁর মধ্যে। আইএফএ-র বিরুদ্ধে যেমন গর্জে উঠেছেন, তেমনি সিএবি কোনও ভুল করলে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। এআইএফএফ, এমনকী সরকারের বিরুদ্ধেও অঞ্জন মিত্রর এই বিপ্লবী সত্ত্বাকে দমানো যায়নি। সব সময় এভাবেই চেষ্টা করে গিয়েছেন একটা রূপরেখা দেওয়ার।
প্রশাসক অঞ্জন মিত্রর মধ্যে যেমন ভিশন ছিল, প্যাশন ছিল, দূরদৃষ্টি ছিল, বিদ্রোহ ছিল, আবেগ ছিল, তেমনই ছিল সকলকে আপন করে নিয়ে, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার দুরন্ত মানসিকতা। আর সে কারণেই তো তিনি মোহনবাগান ছাড়িয়ে ময়দানের অঞ্জনদা হয়ে গিয়েছিলেন।
যিনি এই পথটা দেখিয়ে ছিলেন, আজ সেই অঞ্জন মিত্রকেই মোহনবাগানরত্ন দিয়ে বেধহয় কৃতজ্ঞতা জানালো উত্তর প্রজন্ম। সত্যিই বৃত্ত বোধহয় এভাবেই সম্পূর্ণ হয়!
