ভয় ০ : ভরসা ১০, ফুটবলের নয়া ইন্ডিয়ার সূচনা হল শনিবাসরীয় যুবভারতীতে
ইকোনমিক্সে একটা থিয়োরি আছে, বিগ পুশ থিয়োরি। যখনই কোনও একটা দেশের অর্থনীতি দারিদ্রের চক্রর মধ্যে দিয়ে যায়, তখন সেটার মধ্যেই তাদের চলতে হয় অনেক বছর। লো ইনকাম মানে লো ইনভেস্টমেন্ট। গোটা অর্থনীতি একটা ট্র্যাপের মধ্যে পড়ে যায়। সেখান থেকে বের হতে হলে একটা 'বিগ পুশ' লাগে। অর্থের যোগান বাড়িয়ে, ইনভেস্টমেন্ট বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সেই ট্র্যাপ থেকে বার করতে হয়। ব্রাজিল ম্যাচটা ছিল সেই বিগ পুশ।

অনিলাভ চট্টোপাধ্যায়
ব্রাজিল ৪ ভারত ০
সাহস ১০ ভয় ০
স্কোরকার্ডটা এভাবেও পড়তে পারেন। ৩ অক্টোবর ২০২৬ সল্ট লেক যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ৯৭ মিনিট যা দিল ভারতীয় ফুটবলকে, বিশ্বাস করুন ১২৫ বছরও দিতে পারেনি। অনেক বীরগাথা আছে আমাদের ফুটবলে, অনেক বীরপুরুষ অনেক গর্বের মুহূর্ত দিয়ে গেছেন আমাদের ফুটবলে, কিন্তু আজ যে সাহসের তোরণটা তৈরি করে দেখাল ভারতের ২২ টা ছেলে, সেটা আগে কোনও দিন হয়নি। কারণ আমরা খেলিইনি। আমরা খেলিইনি এই স্তরে। আমরা বুঝতেই পারিনি কোনদিন, ঠিক কী কী লাগে এই পর্যায়ের ফুটবলে। হ্যাঁ আমরা আজ ৪ গোলে হেরেছি। ৪-০! কিন্তু ম্যাচটার ফলাফল হয়ত অন্যরকম হতেও পারত। গুরপ্রীত যদি আজ একটু....! রায়ান উইলিয়ামসের শটটা ব্রাজিল যদি গোললাইন সেভটা না করত....! ইস, রেজাল্টটা যদি ২-১ হত! এরকম 'যদি'র কথা আগেও অনেক আমরা লিখেছি! অনেক আফসোস করেছি, ভালো খেলিয়াও পরাজিতর বহু কাপ, শিল্ড আমাদের ঘরে মজুত আছে বছরের পর বছর ধরে। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে তারা কিন্তু কেউই ব্রাজিল নয়। বরং সাওপাওলো, বোখুম, আইন্দোভেন, বেয়ার্ন মিউনিখ, এশীয় স্তরে জাপান- অনেক নাম মনে পড়ছে, কিন্তু মনে পড়ছে অসহায় আত্মসমর্পণগুলোও। ৪ গোলে আফসোস করছেন, কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, একবারও ভাবেননি, আজ না আবার একটা লজ্জার দিন দেখতে হয়! চেনা পরিচিত, বন্ধু স্বজনদের মধ্যে কেউ একবারও বলেনি, ব্রাজিলের সঙ্গে ম্যাচ খেলবে ভারত! কটা খাবে? আগে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে খেলুক বলে কল্যান চৌবের মুন্ডুপাত করেনি! আজ ম্যাচের শেষে তারাই আফসোস করেছে, ইস ফার্স্ট হাফের ওই দুটো গোল যদি না হত! হ্যাঁ, আজ আফসোস ছিল, লজ্জা ছিল না। ৪ গোলে আত্মসমর্পণ ছিল না, বরং ছিল চোখে চোখ রেখে লড়াই। ইন্ডিয়ান ফুটবল টিম ৮ জন ডিফেন্স করছে, আবার ৬-৭ জন কাউন্টার অ্যাটাকে গিয়ে ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্সিভ থার্ডে সংখ্যাটা বাড়িয়ে ফেলছে! প্রতি মুহূর্তে প্রেস করছে বিপক্ষের মিড থার্ডে। এ কাদের দেখলাম! কোথায় সেই ১১ জনের নিজের বক্সে দাঁড়িয়ে গোল সংখ্যা কমানোর চেনা মরিয়া চেষ্টা! এত নতুন ভারত! ফুটবলের নয়া ইন্ডিয়া!
কত মানুষ স্বপ্ন দেখেন এদেশের ফুটবল নিয়ে, কত কত মানুষ কী প্রচন্ড এফোর্ট দেন এদেশের ফুটবলে। হয়ত কেরলের কোনও অখ্যাত গ্রামের নাম না জানা কোচ তাঁর জীবন দিয়ে দেন একটা ফুটবলার তুলে আনার গর্বটা উপভোগ করার স্বপ্নে, জঙ্গলমহলের শাড়ি পরা এক মহিলা কোচ হয়ত প্রতিটা সকাল আর বিকেল দিয়ে দেন নিজের সন্তানদের বঞ্চিত রেখে, বাংলার কোনও মফস্বলের চেনা একজন হারুদা, দেবুদা কিংবা শিবুদা হয়তো সারা জীবন ভিক্ষা চেয়ে বেড়ান ক্লাবের বাৎসরিক ফুটবল টুর্নামেন্টটা যেন বন্ধ না হয় তার ভাবনায়, ফ্যান ক্লাবের ছেলেটা প্রতিদিন হয়ত টিফিনের কিছু অর্থ বাঁচিয়ে রাখে টিফো বানানোর জন্য। আসলে এদের কোনওটা 'হয়ত' নয়, সবটা সত্যি। ১৪২ নম্বর র্যাঙ্কিংয়ের একটা দেশের ফুটবল চলছে শুধু এটুকুর জন্য। এই প্যাশনটার জন্য। আর সেটুকুর জন্য সবাই লড়ছে। পঞ্জাবে রঞ্জিত বাজাজ লড়লে, আমাদের ছোটদের কোচ রঞ্জন চৌধুরী কিংবা অমিয় ঘোষও লড়ছেন। বাইচুং লড়ছে, আনচেরি, ব্যারেটোও লড়ছে। দেবজিৎ ঘোষ, পল্লব বসু মল্লিকরা কমেন্ট্রি বক্সে লড়লে প্রেস বক্সে মার্কাস, সাঈফরাও লড়ছে। আলিপুরের অফিসে গোয়েঙ্কার টিম লড়লে আর্মির অফিসে বসে ডুরান্ড কমিটি কিংবা চেরি ট্রি লড়ছে। কলকাতার সুতারকিন স্ট্রিটের অফিসে সারা বছর বাংলার ফুটবলে অর্থের ব্যবস্থা করার অনির্বাণ দত্তরা যেমন লড়ছেন, তেমনই দিল্লির দ্বারকায় বসে এদেশের ফেডারেশনও লড়ছে। ১৪০ কোটির দেশে ফুটবল চালানোর মত অর্থবল, লোকবল কিচ্ছু নেই তাঁদের। আছে শুধু ওই প্যাশনটাই। কিন্তু দিনের পর দিন এই প্যাশনের পিছনে লুকিয়ে রাখা অর্থাভাবটা যেটা ক্ষতি করে দেয় তা হল আত্মবিশ্বাসের। সাহসটাই কমিয়ে দেয় সংক্রমণের মত। কর্তাদের সাহস কমায়, কর্মীদের কমায়, ফুটবলারদেরও কমায়। কাউকে কোনও কিছু দাগিয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু আগে পরে কতটা কী, কে আর খতিয়ে দেখি আমরা। তিন দশক আগে ডানা কাপে ফাইনাল খেলে আসা অমিয় ঘোষ বাড়িতে প্রায় বসে থাকেন,সেখানে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফেরা মেয়র একাদশ উঠে যায়, সেখানে অলস্টার ইলেভেনে চান্স পাওয়া জয়ন্ত সেনকে সবাই ভুলে যায়, কিন্তু ওই একই টুর্নামেন্ট জিতে রঞ্জিত বাজাজ ভারত কাঁপান। কারণ তাঁর অর্থ আছে, মিডিয়া আছে, মিনার্ভা একাডেমির মাধ্যমে প্রশাসনিক যোগাযোগও অনেক। তাই প্রতিনিয়ত তিনি এদেশের ফুটবল প্রশাসনকে অসম্মান করেন, অপমান করেন, চুপ করে থাকে ফেডারেশন। চুপ করে থাকে যখন তাঁকে গিলে খেতে চায় ভারতের কোনও বানিজ্যিক সংস্থা। সস্তায় কিনে নিতে চায়। ভুল ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়। ফেডারেশনের অর্থ নেই, সাহস নেই।
সাহসটা অন্যভাবে তৈরি করছিলেন কল্যান চৌবে, সত্যনারায়ণরা। পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে নিজেদের ১৩৮ নম্বরে থাকা টিমটার সঙ্গে খেলিয়ে দেওয়ার ভাবনাটাই সাহসের ছিল। একটা খারাপ, লজ্জার রেজাল্ট সবটা শেষ করে দিতে পারত। তারসঙ্গে ওই বিরাট আর্থিক ঝুঁকি। পালটা যুক্তিগুলো তৈরি ছিল। কী হবে এই টাকা খরচ করে, এই টাকা দিয়ে একাডেমি হতে পারত অনেকগুলো। ভুল। এই যে টাকাটা দেখছেন, এই যে কর্পোরেটগুলোর স্পনসর হিসেবে এগিয়ে আসা দেখছেন, সবটা ব্রাজিল এসেছে বলেই। অ্যাকাডেমি করব বলে এদের কাছে গেলে কেউ একটা টাকা দিয়ে সাহায্য করত না। মোবাইলের দুনিয়াতে তো এখন আমরা সবাই এখন খুবই এমপাওয়ার্ড। প্রতিদিনই রাজা উজিরদের মাথা কাটছি। বাচ্চাদের জন্য একটা ফুটবল অ্যাকাডেমি করবেন বলে ক্রাউড ফান্ডিংয়ের আবেদন করুন বরং। দেখুন কটা লোক টাকা দেয়! অথচ এরাই ৬০০০ টাকা দামের টিকিট কাটে সল্ট লেক স্টেডিয়ামে ঢোকার জন্য। কারণ, উল্টোদিকের টিমটার নাম ব্রাজিল। বিশ্বাস করুন, আমাদের ফুটবলে ওই ৬০০০ টাকা, ১৫০০০ টাকায় টিকিট কাটা লোকটারও দরকার আছে। যে আমলা, যে মন্ত্রীরা ব্রাজিল এসেছে বলে স্টেডিয়ামে এলেন সদলবলে,দরকার আছে তাঁদেরও। তাঁরাও ওই বিশ্বাসটা আর সাহসটা নিয়ে গেল, ফুটবলের ওপর ভরসা করা যায়! মনভীর, অভিষেক, আনোয়ারদের ওপর ভরসা করা যায়। কল্যান চৌবে, অনির্বাণ দত্ত, দেবাশিস-সৃঞ্জয়, দেবব্রত সরকার কিংবা নবাবদের ওপর ভরসা করা যায়। ভয় কাটাচ্ছে ওরা, এবার একটু 'ভরসা ইন' চাই।
ইকোনমিক্সে একটা থিয়োরি আছে, বিগ পুশ থিয়োরি। যখনই কোনও একটা দেশের অর্থনীতি দারিদ্রের চক্রর মধ্যে দিয়ে যায়, তখন সেটার মধ্যেই তাদের চলতে হয় অনেক বছর। লো ইনকাম মানে লো ইনভেস্টমেন্ট। গোটা অর্থনীতি একটা ট্র্যাপের মধ্যে পড়ে যায়। সেখান থেকে বের হতে হলে একটা 'বিগ পুশ' লাগে। অর্থের যোগান বাড়িয়ে, ইনভেস্টমেন্ট বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সেই ট্র্যাপ থেকে বার করতে হয়। ব্রাজিল ম্যাচটা ছিল সেই বিগ পুশ। যার ফলো আপ প্রোগ্রাম চললে এদেশের ফুটবল বদলাতে পারে। কারণ কাল মনভীররা শুধু নিজেরা বোঝেননি, গোটা দেশের ফুটবল সাপোর্টার, স্পনসর, স্টেক হোল্ডারদের বুঝিয়েছেন, আমরা এখনও পারি, ওই স্টেজে খেলতে। আমাদের একটা কল্যান চৌবে ছিল না যে সব অপবাদের কলঙ্ক মাথায় নিয়ে ব্রাজিল, উরুগুয়ে, পানামার সঙ্গে ম্যাচ আয়োজন করার সাহস করতে পারবে।
ব্রাজিল নাকি গা লাগিয়ে খেলেনি, বাঙালি যখন এসব আলোচনা হবে না! শুরু হয়েছে! ম্যাচের ৯৪ মিনিটেও যে দলটা গোল পাওয়ার জন্য একের পর এক অ্যাটাক চালিয়ে যাচ্ছে বিপক্ষের বক্সে, তারা নাকি মন দিয়ে খেলেনি। আরে দাদা, এতটা কৃপণ হবেন না, যার যেটা প্রাপ্য সেটা দিন। সকালে ঘুম থেকে যে মোবাইলে আলোচনা করেছে বন্ধুর সঙ্গে যে আজ ভারত কটা খাবে, সেও দেখছি বলছে, একটা গোল দেওয়া উচিত ছিল। আর হ্যাঁ, ফিফা ফ্রেন্ডলি মানে আসলে ওটা ফ্রেন্ডলি নয়। সাম্প্রতিক অতীতে ফিফার ফ্রেন্ডলি ম্যাচগুলোয় বড় ব্যবধানের জয়গুলো শুনবেন? পানামা ৬-২, ক্রোয়েশিয়া ৩-১, সাউথ কোরিয়া ৫-০, টিউনেশিয়া ৫-১! ভারত ৪- ০! ওরা সবাই বিশ্বকাপ খেলে, আর আমরা ফিফা ফ্রেন্ডলি আয়োজন করলেও গেল-গেল করি! সত্য সেলুকাস!
কাল স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে খুব আবেগতাড়িত লাগছিল। তিনটে বিশ্বকাপ কভার করেছি! খুব অনাহুত লাগত! এমন একটা দেশ থেকে মিডিয়া সেন্টারে বসি, যাদের অন্য দেশের সাংবাদিকেরা জিজ্ঞেস করে, ইন্ডিয়া! তোমরা এখানে কী করছো! কতবার উত্তর দিয়েছি সে প্রশ্নের! প্রেস কনফারেন্সে আমরা লাস্ট প্রায়োরিটি। এই ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার নিয়েই কত সময় ওদের জয়গাথা লিখেছি। তার বেশি আমাদের অ্যাক্সেস কোথায়! কাল ওদের বিপক্ষে শেষ অবধি আমাদের দেশ খেলল। প্রতি মুহূর্তে স্কোরবোর্ডটা দেখছিলাম। ২৭ মিনিট ৫৩ সেকেন্ড অবধি ওটা গোলশূন্য ছিল। ব্রাজিল ০ ভারত ০! আমি পড়ছিলাম, ভয় ০ ভরসা ১০! ওই ভরসাটাই আসলে সাহস! খালিদের সাহস, কল্যানের সাহস! অস্বীকার করবেন না প্লিজ! অনেক গালাগাল তো দিলেন!
২০০৩ সাল আসিয়ান কাপে গেলাম যখন এই সাহস দেখেছিলাম আরেকটা লোকের চোখেমুখে। আমি সিওর ভৌমিকদা বেঁচে থাকলে খুব খুশি হতেন। আসিয়ান জয়টা সাহস দিয়েছিল খুব। সুভাষ ভৌমিক বলতেন, 'আমিই নষ্ট করেছি সেই মোমেন্টামটা।" তবু আসিয়ান ছিল থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন্স আর ইন্দোনেশিয়া নিয়ে। এই লিটমাস টেস্টটা আগে তো কোনদিন হয়ইনি ভারতের ফুটবলে। কিন্তু এবার আর মোমেন্টামটা নষ্ট হতে দেবেন না প্লিজ। ফিফা ফ্রেন্ডলি খেলতে আর্জেন্টিনাকে দেখলে দাঁত নখ বার করে ঝাঁপিয়ে পড়বেন না ভাই!
সাংবাদিক মানস চক্রবর্তীকে মনে পড়ছে। মানসদার খুব ইচ্ছে ছিল, ভারত যেদিন বিশ্বকাপ খেলবে, ভারতের তিরঙ্গাটা নিয়ে সেন্টার সার্কেলে পুঁতে দিয়ে আসবে। স্বপ্ন যেমন হয় আর কী! স্বপ্নটা অধরা রেখেই মানসদা ড্রেসিংরুমে ফিরে গেছে। আরও কত মানুষ চলে গেছে এভাবেই। মরার আগেই একবুক ইচ্ছেকে মরে যেতে দেখে। কেউ কেউ এখনও বেঁচে আছে। তাঁরা কেউ নিজের পয়সায় ক্লাব চালায়, নিজের পয়সায় বুট কিনে দেয় পাড়ার গরীব ছেলেটাকে। জানিনা, কেন যেন মনে হচ্ছে, তাদের সবার স্বপ্নগুলো এবার সত্যি হবে। কতদিন লাগবে জানিনা! ততদিনে আমরাও সাজঘরে ফিরে যাব কিনা জানিনা! কিন্তু ভারতের ফুটবল আরও একশো বছর আননোটিশড থাকবে না! থাকতে পারেনা। ব্রাজিল ম্যাচটার তাই দরকার ছিল খুব। খুব দরকার ছিল।








