ফরাসি আক্রমণের সঙ্গে স্প্যানিশ রক্ষণের ধুন্ধুমার লড়াই, মহাকাব্যিক ম্যাচের অপেক্ষায় ডালাস
এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা দুই দল, তাই তো দুই ইউরোপীয় মহাশক্তির লড়াই ঘিরে এত উন্মাদনা, এত রোমাঞ্চ। অনেকই বলছেন, হয়ত ঠিকই বলছেন, যে ফাইনালটা হয়ে যাচ্ছে সেমিফাইনালেই।

গৌতম রায়
ম্যাচে কী হবে? ডালাসে কারা করবে বাজিমাত? কিলিয়ান এমবাপে না লামিন ইয়ামল, কে হবেন সুপার হিরো? এইসব প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে। কোটি টাকার এইসব প্রশ্নের উত্তর হয়ত ম্যাচ শেষের আগে পাওয়া সম্ভব নয়। ফ্রান্স বনাম স্পেন – এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা দুই দল, তাই তো দুই ইউরোপীয় মহাশক্তির লড়াই ঘিরে এত উন্মাদনা, এত রোমাঞ্চ। অনেকই বলছেন, হয়ত ঠিকই বলছেন, যে ফাইনালটা হয়ে যাচ্ছে সেমিফাইনালেই।
এই সেমিফাইনাল পর্বটা কিন্তু সাম্প্রতিক অতীতে এই ডুয়েলে ফ্রান্সের কাছে একেবারেই সুখকর নয়। ২০২৪ ইউরো সেমিফাইনালে এই ফ্রান্সকে হারেয়েছিল স্পেন। ২০২৫ উয়েফা নেশনস লিগের সেমিফাইনালেও একই ফল। আবার সে্ই সেমিফাইনাল। দুবার সেমিফাইনালে হারের বদলাটা কি ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে নিতে পারবেন কিলিয়ান এমবাপেরা?
দুটো তথ্য একটা ছবিকে স্পষ্ট করে দিচ্ছে। এখনও পর্যন্ত গোটা প্রতিযোগিতায় মোট ৬টি ম্যাচে স্পেনের গোল লক্ষ্য করে শট হয়েছে মাত্র সাতটি। আবার এখনও পর্যন্ত ফ্রান্স ১৬টি গোল করে বসে আছে। অর্থাৎ স্পেনের রক্ষণ কতটা দুর্ভেদ্য এবং ফ্রান্সের আক্রমণ কতটা বিধ্বংসী, সেটাই তুলে ধরছে ওই দুটি তথ্য। তাই সেমিফাইনালের মেগা লড়াইয়েও ফ্রান্সের অ্যাটাকারদের সঙ্গে স্পেনের ডিফেন্ডার ও মিডফিল্ডারদের মধ্যে আসল লড়াইটা হতে যাচ্ছে।
কী দুর্ধর্ষ ফরাসি আক্রমণ! অধিনায়ক এমবাপের কথা বাদ দিন। সব কিছু নিয়ে নিজেই একটা গোটা প্যাকেজ। তাঁর দোসর আবার দেম্বেলে। বিধ্বংসী এই দুজনের একটু পিছনে আবার ওলিজে। বায়ার্নে যে ঝড় তোলেন সেটাকেই তুলে এনেছেন বিশ্বকাপের মঞ্চেও। যেভাবে খেলাচ্ছেন দলের আপফ্রন্টকে, সেটার জন্যই এমবাপে-দেম্বেলেরা আরও অপ্রিতরোধ্য। আরও ভয়ঙ্কর। এঁদের সঙ্গত করার জন্য আবার রয়েছেন পিএসজি তারকা দুয়ে। কাকে ছেড়ে যে কাকে ধরা যাবে!
এটা কিন্তু মুদ্রার একটা দিক। উল্টোদিকটাও দেখুন। লাপোর্তে, কাবারসিরা স্পেনের এমন রক্ষণব্যূহ তৈরি করেছেন যে একমাত্র বেলজিয়াম একটা গোল করা ছাড়া গোটা প্রতিযোগিতায় আর কেউ এই রক্ষণ ভেঙে গোল করতে পারেনি। লাপোর্তে-কাবারসিদের দুই পাশে রয়েছেন কুকুরেয়া ও পেদ্রো পোরো। এই রক্ষণের সামনে দাঁড়িয়ে অবশ্য বিশাল একটা ভূমিকা নিচ্ছেন ম্যান সিটি তারকা রড্রি। মাঝমাঠেই থামিয়ে দিচ্ছেন প্রতিপক্ষের অনেক ঝড়। তাই দুনিয়ার সেরা আক্রমণভাগের সঙ্গে দুনিয়ার সেরা রক্ষণের রোমাঞ্চকর লড়াই।
লড়াই আর একটা আছে। রড্রি, পেড্রি, গেমমেকার ড্যানি ওলমোদের সোনার স্প্যানিশ মাঝমাঠ ফুল ফোটাচ্ছে। পাস, পাস, পাসের বন্যায় ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে প্রতিপক্ষকে। এটাকে থামানোও একটা বড় চ্যালেঞ্জ ফরাসিদের কাছে। যা শোনা যাচ্ছে, এই তেল দেওয়া মেশিনের মত মসৃন স্প্যানিশ মাঝমাঠকে অকেজো করে দেওয়ার জন্য মেগা যুদ্ধে কন্তেকে ব্যবহার করতে পারেন দিদিয়ের দেশঁ। গোটা মাঠ জুড়ে অক্লান্ত পরিশ্রমও করতে পারেন এই ফরাসি মিডিও। তিনিই হতে পারেন দেশঁর তুরূপের তাস।
তবে ফরাসি মাঝমাঠও কি কম সাজানো! মাঝমাঠের ডুয়েলটা জেতার জন্য অঙ্ক কষে চলেছেন দেশঁ ও ফুয়েন্তে।
এই সোনার দলকে নিয়ে হয়ত আত্মবিশ্বাসের চূড়ায় ফরাসি কোচ। তবে তাঁর সেই জায়গাটায় কিছুটা ধাক্কা দিতে পারে তাঁর রক্ষণ। ফ্রান্সের আক্রমণভাগ ও মাঝমাঠে যে দক্ষতা, গতি ও মোবিলিটি রয়েছে, ডিফেন্সে যেন তার কিছুটা অভাব। তাই গতিময় স্প্যানিশ আক্রমণ এই জায়গাটায় কঠিন চ্যালেঞ্জে ফেলে দিতে পারে। তার জন্য রয়েছেন যে আর একজন, লামিন ইয়ামল। এরমধ্যেই হুঙ্কার দিয়েছেন, এটা তাঁর কেরিয়ারের হয়ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ হতে যাচ্ছে। ভুললে তো চলবে না যে, ফুয়েন্তের দলের সেরা অস্ত্র তিনিই।
এই পরিস্থিতিতে খেলা কেমন হবে? ফ্রান্সের দুর্ধর্ষ আক্রমণের কথা মাথায় রেখে ফুয়েন্তে হয়ত ডিফেন্সিভ অরগাইনেশনকে আরও বেশি জমাট করে নজর দিতে পারেন প্রতিআক্রমণ নির্ভর ফুটবলে।
এর বাইরে আর একটা ফ্যাক্টর। দুটো দলে এত বেশি একক দক্ষতায় ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার ফুটবলার, যে কোনও মুহূর্তে যে কেউ সব হিসাব ওলট পালট করে দিতে পারেন, সব অঙ্কই গুলিয়ে দিতে পারেন। নামগুলো যে কিলিয়ান এমবাপে, লামিন ইয়ামল! তাই যেখানে কোনও অঙ্ক থাকে না, ব্যাখ্যা থাকে না, তেমনই কি কোনও মহাকাব্যিক ম্যাচ? কোনও এক রূপকথা?
