ডাইনির হাড়, নীল জার্সি, লাল সুতো
আর্জেন্তাইনদের কাছে 'কাবালা' শব্দের মানে কুসংস্কার। এবারও সেই 'কাবালা' কিন্তু বেশ জাঁকিয়ে বসেছে।

অর্কদ্যুতি রায় (অতিথি লেখক)
ম্যাচের পরে একবার পেলে তাঁর জার্সিটি এক ভক্তকে উপহার দেন। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার পরেই 'অফ ফর্ম' শুরু হয় ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তির। পেলে তখন তাঁর এক বন্ধুকে বলেন যেখান থেকে হোক সেই ভক্তকে খুঁজে বের করে জার্সিটি ফিরিয়ে আনতে হবে। বেশ কিছুদিন পরে সেই বন্ধু পেলেকে তাঁর জার্সিটি খুঁজে এনে দেন। পেলেও ফর্মে ফেরেন। যদিও সেই বন্ধুটি পেলেকে ওই জার্সিটির মতোই হবহু একই দেখতে একটি জার্সি বাজার থেকে কিনে এনে দেন। ফুটবল সম্রাট প্রতিজ্ঞা করেন, ওই জার্সিটি আর কখনও কাউকে দেবেন না।

আসলে অন্ধবিশ্বাসের সঙ্গে খেলাধুলার বেশ প্রাচীন সম্পর্ক। শুধু ফুটবল নয়। ক্রিকেট থেকে হকি, বেসবল। কিংবা বাস্কেটবল। অলিম্পিক্সেরও হাজারো খেলায় কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে বেশ মজার মজার ঘটনা ঘটিয়েছেন অ্যাথলিট, ক্রীড়াবিদরা।
বিশ্বকাপের ম্যাচে কোনও চেয়ারে বসে থাকাকালীন যদি ব্রাজিল গোল করে, তবে সেলেকাওদের সমর্থকেরা গোটা ম্যাচে অন্য কোথাও বসবেন না সেই চেয়ার ছেড়ে। অতীতে ফরাসি কোচ রেমন্ড ডোমেনেক দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে জ্যোতিষশাস্ত্রের উপর প্রবল ভরসা করতেন। আবার আফ্রিকান দেশগুলোর মধ্যে খেলা চলাকালীন 'জাদুটোনা' বা 'তুকতাক' করার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। ২০১০ বিশ্বকাপে অক্টোপাস 'পল' ভবিষ্যদ্বাণী করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। সেবার প্রোটিয়াদের দেশের বিশ্বযুদ্ধে ফাইনাল-সহ মোট আটটি ম্যাচের সঠিক ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয় অক্টোপাসটি। এমনকী দির্ঘদিন যাবৎ সেই অক্টোপাস 'পল'-এই মজেছিলেন স্প্যানিশ তারকা ইনিয়েস্তা।

ড্রেসিংরুমে সবার শেষে শর্টস পরলে ম্যাচে ভাল রেজাল্ট হবে। এমন অন্ধবিশ্বাস ছিল ব্রিটিশ কিংবদন্তি ববি মুরের। ইংরেজ স্ট্রাইকার গ্যারি লিনেকার কখনও ওয়ার্ম আপের সময় গোলে শট নিতেন না। লিনেকারের বিশ্বাস ছিল, ঈশ্বর ওঁর জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক গোল ঠিক করে রেখেছেন। তাই ওয়ার্ম আপের সময় তিনি যদি গোল করে ফেলেন, তাহলে বরাদ্দ গোলসংখ্যা কমে আসবে। সংখ্যার বিচারে টান পড়বে ম্যাচের সময়। প্রাক্তন ব্রিটিশ অধিনায়ক জন টেরি অন্ধবিশ্বাসে ভর করে টিম বাসে চিরকাল একই সিটে বসতেন। গাড়িতে গেলে হেডফোনে একটাই গান বারবার শুনতেন। পার্কিংয়ে একই জায়গায় গাড়ি পার্ক করতেন।
বিশ্বখ্যাত গোলরক্ষকদের অনেকের মধ্যেই কুসংস্কার চরমে। আইরিশ দুই গোলকিপার প্যাকি বোনার এবং শে গিভেন ম্যাচ চলাকালীন প্রবল কুসংস্কারাচ্ছন্ন থাকতেন। গিভেন সবসময় গোলপোস্টের ঠিক পিছনে একটি শিশিতে অল্প জল রাখতেন। আবার বোনার তো রীতিমতো তাঁর জন্মস্থানের মাটি এনে রাখতেন তেকাঠির পিছনে। স্প্যানিশ গোলরক্ষক ক্যাসিয়াসের অন্ধবিশ্বাস এতটাই যে উনি নিজের জার্সির হাতা নিজেই কেটে ফেলতেন। কখনও আবার ইচ্ছে করে উল্টো মোজাও পরতেন।
পর্তুগিজ কিংবদন্তি ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো হেভিওয়েট ম্যাচের আগে বিমান থেকে নামার সময় মাটির দিকে আগে ডান পা এগিয়ে দেন। পর্তুগালের জার্সিতে টানেল থেকে ওঠার সময় মাঠে ডান পা এগিয়ে দেন রোনাল্ডো। ব্রাজিলিয়ান রোনাল্ডোও বরাবর একই কাজ করতেন। এগিয়ে রাখতেন ডান পা।

১৯৭০-এর বিশ্বকাপের আগে তো ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে। বিশ্বকাপের যোগ্যতা নির্ণায়ক ম্যাচে জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে নামার আগে এক ডাইনির শরণাপন্ন হয় অজি ব্রিগেড। অস্ট্রেলিয়ান ফুটবলাররা সেই ডাইনির দেওয়া কিছু হাড় পুঁতে রেখেছিলেন বিপক্ষের গোলপোস্টের নিচে।
বর্তমানে মার্কিন মুলুকে ফুটবল বিশ্বকাপ এক্কেবারে শেষ ল্যাপে দৌড়চ্ছে। আগামী রবিবার মেটলাইফ স্টেডিয়ামে কাপের মাথায় কারা চুমু খাবেন তা জানতে প্রতীক্ষায় গোটা বিশ্ব। ইতিমধ্যেই ফ্রান্সকে ছিটকে দিয়ে ফাইনালে স্পেন। তবে দ্বিতীয় সেমিফাইনাল আর্জেন্তিনা-ইংল্যান্ড মহারণ ঘিরে বিশ্ব জুড়ে উত্তেজনার পারদ চরমে। একদিকে ইংল্যান্ডের টাফ ফুটবল। টাইট ফুটবল। অন্যদিকে, শেষ তিনটি ম্যাচে প্রায় খাদের কিনারা থেকে ফের বিশ্বযুদ্ধের মঞ্চে আর্জেন্তিনার ফিরে আসা। সব মিলিয়ে, যুযুধান দু'পক্ষের লিও মেসি না হ্যারি কেন, কার গালে চওড়া হাসি দেখবে ফুটবল দুনিয়া, তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছেই।
এরই মাঝে স্কালোনি ব্রিগেডের কুসংস্কার ঘিরে জোর আলোচনা ফুটবল মহলে। আকাশী-সাদা কিংবা নীল-সাদা নয়। পুরো নীল জার্সি পরেই ব্রিটিশ বধ করতে চাইছেন মেসিরা।
চলতি বিশ্বকাপে একমাত্র জর্ডনের বিরুদ্ধেই সম্পূর্ণ নীল' জার্সিতে নেমেছিল আর্জেন্তিনা। সেই ম্যাচে ৩-১ গোলে জর্ডনকে হারিয়েছিল স্কালোনি ব্রিগেড। ফের সেই একই গাঢ় নীল জার্সি পরে হ্যারি কেনদের বিরুদ্ধে নামতে চাইছে আর্জেন্তিনা। ইতিমধ্যেই ফিফা-র কাছে টিম ম্যানেজমেন্টের তরফে সেই অনুরোধ জানানো হয়েছে। ফিফা-ও অনুমতি দিয়েছে বলেই জানা গিয়েছে।
প্রসঙ্গত, ১৯৬৬ এবং ২০০২-এর অভিশাপ ঘোচাতে চাইছেন মেসিরা। সেই দু'বারই আর্জেন্তিনা তার চিরাচরিত আকাশী-সাদা জার্সি পরে নেমেছিল ইংরেজদের বিরুদ্ধে। দু'বারই হেরেছিল আর্জেন্তিনা। ১৯৬৬-তে বিশ্বকাপের আসর বসেছিল ইংরেজদের বধ্যভূমিতে। সেবার ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ০-১ গোলে হেরে যায় আর্জেন্তিনা। ২০০২ সালেও ফলাফল একই। গ্রুপ পর্যায়ে সেবারও ০-১ গোলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে হার মানতে বাধ্য হয় আর্জেন্তাইনরা।

অন্যদিকে, ১৯৮৬ - যেবার বিশ্বজয়ী হয়েছিল মারাদোনার টিম, সেবার ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নীল জার্সি পরেই মাঠে নেমেছিল আর্জেন্তিনা। মেক্সিকোর মাটিতে ইংরেজদের ২-১ গোলে হারায় আলবিসেলেস্তারা। সেই কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে দক্ষিণ আমেরিকান দেশটির হয়ে দু'টি গোলই করেন দিয়েগো মারাদোনা। যারমধ্যে আলোড়ন ফেলে দেওয়া 'হ্যান্ড অফ গড' গোলটিও রয়েছে। যদিও ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে আকাশী-সাদা জার্সি পরে নেমে বিজয়ী হয়েছিল মারাদোনা ব্রিগেড। আবার ১৯৯৮-তেও সেই নীল জার্সিতেই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে জেতে আর্জেন্তিনা। আসলে বিপক্ষে যখন ব্রিটিশরা, তখন যে জার্সি পরে দু'বার চিরশত্রুদের হারিয়েছিল মারাদোনার দেশ, সেই জার্সিকেই এবার বাড়তি গুরুত্ব দিতে চাইছে টিম স্কালোনি।
আর্জেন্তিনার ফুটবলপ্রেমীদের সাফ কথা, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপে দু'বার আকাশী-সাদা জার্সি পরে তাদের দেশকে হারতে হয়েছে। আবার নীল জার্সি পরে দু'বার জয় এসেছে। তাই বিশ্বাস হোক বা কুসংস্কার; পুরো নীল জার্সি পরেই ফের জয় আসবে।

আর্জেন্তিনার অন্ধবিশ্বাসের প্রসঙ্গ উঠলে গায়কোচিয়ার নাম আসবেই। টাইব্রেকার হোক কিংবা পেনাল্টি শুট আউট। বিপক্ষের ফুটবলার শট নেওয়ার ঠিক আগেই মূত্র ত্যাগ করতে ছুটতেন আর্জেন্তাইন গোলকিপার। ১৯৯০ সালে যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ালে গায়কোচিয়া মাঠের ধারেই মূত্র ত্যাগ করেন। শুধু সেই ম্যাচ নয়, সেমিফাইনালে ইতালির বিরুদ্ধেও একই কাজ করেন গায়কোচিয়া। জিতেও যান সেই ম্যাচ। কুসংস্কারের প্রকোপ থেকে বাদ যাননি মারিও কেম্পেসও। ১৯৭৮ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্যায়ে গোল পাচ্ছিলেন না আর্জেন্তাইন স্ট্রাইকার। তখন কেম্পেসের কেতাদুরস্ত গোঁফ ছিল। তৎকালীন আর্জেন্তাইন কোচ সিজার লুই মেনোত্তি কেম্পেসকে গোঁফ ছেঁটে ফেলার পরামর্শ দেন। রেজাল্ট - পর পর তিন ম্যাচে 'ক্লিন শেভড' হয়ে পোল্যান্ড, পেরু এবং নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে দু'গোল করে মোট ছয় গোল করেন কেম্পেস। জেতেন সোনার বুট।

কুসংস্কার গ্রাস করেছে লিওনেল মেসিকেও। ২০১৮ বিশ্বকাপে এক সাংবাদিক বন্ধুর থেকে একটি লাল রঙের মোটা সুতো পেয়েছিলেন মেসি। তারপরেই নাইজেরিয়া ম্যাচে গোল করেন তিনি। সেই থেকে এখনও সেই সুতোটি হাতছাড়া করেননি। সরি, ভুল হল। পা-ছাড়া করেননি মেসি।
১৯৮৬-তে বিশ্বকাপের আগে মারাদোনা-সহ গোটা দলকে আর্জেন্তিনার জুজুই প্রদেশের তিলকারা মন্দিরে নিয়ে গিয়েছিলেন কোচ কার্লোস বিলার্দো। সেবার চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্তিনা। কিন্তু বিশ্বজয়ের পরে সেই মন্দিরে আর যাননি মারাদোনারা। ২০২২-এ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে ফের মেসিকে নিয়ে তিলকারা মন্দিরে যান আর্জেন্তিনা ফুটবল সংস্থার প্রধান ক্লদিয়া তাপেয়া।
আলবিসেলেস্তেরা বিশ্বাস করেন, তিলকারা মন্দিরে গিয়ে পুণ্যলাভ করেন মেসি। তাই এবারও বিশ্বজয় হবেই। এ ছাড়াও কাতারের হোটেলে ২০১ নম্বর ঘরে থাকতেন মেসি। আর্জেন্তাইনদের মতে, ২০১ মানে ২ আর ১ যোগ করলে ৩ হয়। মারাদোনার দেশ এখনও পর্যন্ত তিনবার বিশ্বজয়ী হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, এবার নাকি স্কালোনির ছেলেরা যে হোটেলেই উঠছে, মেসির জন্য বরাদ্দ থাকছে ২০২ নম্বর ঘর। ২+২ যোগ করলে চার হয়। চতুর্থবার কি তাহলে.....? সময় বলবে। আর্জেন্তাইনদের কাছে 'কাবালা' শব্দের মানে কুসংস্কার।
এবারও সেই 'কাবালা' কিন্তু বেশ জাঁকিয়ে বসেছে।
