বিশ্বকাপে প্রথম পাকিস্তানি বংশোদ্ভুত ফুটবলার, ইতিহাস গড়লেন জিদান ইকবাল
ম্যানচেস্টারে জন্ম নেওয়া মিডফিল্ডার জিদান ইকবালই প্রথম পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ফুটবলার, যিনি ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলেছেন।

এক্সট্রাইম ওয়েব ডেস্ক: স্কোরবোর্ডে তখন নরওয়ের বিপক্ষে ইরাকের ৪-১ ব্যবধানে পরাজয়। ৪০ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে আসা ইরাকের জন্য এটি ছিল হতাশাজনক শুরু। নরওয়ের তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড নিজের বিশ্বকাপ অভিষেকে দুটি গোল করে দলকে সহজ জয় এনে দেন।
তবে পাকিস্তানের কাছে ফলাফলটা ছিল গৌণ।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের ফক্সবরো শহরের বোস্টন স্টেডিয়ামে ম্যাচের ৫৯তম মিনিটে ইরাকের হয়ে মাঠে নামেন জিদান ইকবাল। আর সেই মুহূর্তেই ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান তিনি। জিদান হয়ে ওঠেন ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রথম পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ফুটবলার।
পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দল কখনোই বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে দলটির অবস্থান ১৯৮তম। ২৫ কোটিরও বেশি মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরকে দূর থেকেই দেখেছে। জিদান ইকবালের মাধ্যমে সেই বাস্তবতায় প্রথমবারের মতো একটি নতুন অধ্যায় যুক্ত হলো।
জিদান আম্মার ইকবালের জন্ম ২০০৩ সালের ২৭ এপ্রিল ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে। তাঁর বাবা আম্মার ইকবালের বাড়ি পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের সাহিওয়াল শহরে, আর মা আয়াত ইকবাল দক্ষিণ ইরাকে জন্মগ্রহণ করেন।
এই পারিবারিক পটভূমির কারণে জিদানের সামনে ছিল তিনটি জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ—ইংল্যান্ড, পাকিস্তান কিংবা ইরাক।
তবে তাঁর ইরাককে বেছে নেওয়ার গল্পটা বেশ ব্যতিক্রমী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবাসী ইরাকিদের নিয়ে কাজ করা একটি জনপ্রিয় ইনস্টাগ্রাম পেজ প্রথম তাঁর পারিবারিক পরিচয় সম্পর্কে খোঁজ নেয়। পরে বিষয়টি পৌঁছে যায় ইরাক ফুটবল ফেডারেশনের কাছে। একাধিক ভিডিও কলে জিদান ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফেডারেশন তাকে জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার জন্য রাজি করায়।
ক্রীড়া মাধ্যম দ্য অ্যাথলেটিক-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জিদান বলেন,
"ইরাকের সমর্থকরা এবং ফেডারেশন আমাকে যেভাবে ভালোবাসা ও সম্মান দেখিয়েছে, সেটাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছে।"
প্রথমদিকে সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে কিছুটা অস্বস্তি থাকলেও বারবার ইরাকে যাওয়ার মাধ্যমে দেশটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গভীর হতে থাকে। একসময় ইরাক তাঁর পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
মাত্র আট বছর বয়সে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একাডেমিতে যোগ দেন জিদান। প্রায় ১২ বছর ক্লাবটির সঙ্গে কাটানোর পর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ১৮ বছর বয়সে তিনি ইউনাইটেডের হয়ে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে মাঠে নামেন। এর মাধ্যমে প্রায় দুই দশক পর প্রথম ব্রিটিশ-দক্ষিণ এশীয় খেলোয়াড় হিসেবে ইউনাইটেডের সিনিয়র দলে অভিষেক ঘটে তাঁর।
তবে নিয়মিত প্রথম একাদশে জায়গা পাননি। পরবর্তীতে প্রায় ১০ লাখ ইউরো ট্রান্সফার ফিতে নেদারল্যান্ডসের ক্লাব এফসি উট্রেখটে যোগ দেন তিনি।
ইরাকের দীর্ঘ ২১ ম্যাচের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে জিদান ছিলেন দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গোলসহ ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ইরাককে বিশ্বকাপের মূলপর্বে পৌঁছাতে সাহায্য করে।
পাকিস্তান ফুটবল ফেডারেশনও জিদানের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পাকিস্তান ও ইরাকের ফুটবল পরিকাঠামোর মধ্যে ব্যবধান ছিল অনেক বেশি।
ফুটবল পাকিস্তান ডটকমের সম্পাদক আলী আহসান বলেন, পাকিস্তানের বর্তমান ফুটবল কাঠামো আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়দের আকৃষ্ট করার মতো অবস্থায় নেই।
তাঁর ভাষায়,
"আমাদের ফিফা র্যাঙ্কিং, পেশাদার অবকাঠামোর অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে জিদানের মতো খেলোয়াড়দের আকৃষ্ট করা কঠিন। ইরাক তাকে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলার বাস্তব সুযোগ দিয়েছে, যা পাকিস্তানে পাওয়া সম্ভব হতো না।"
তবে আহসানের মতে, যদি জিদান পাকিস্তানকে বেছে নিতেন, তাহলে দেশের ফুটবলের প্রতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ অনেকটাই বাড়তে পারত এবং নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের অনুপ্রাণিত করতে পারতেন।
বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার পর জিদান ইকবাল বলেন,
"আমি আশা করি, এশিয়ান, আরব কিংবা যে কোনো পটভূমির শিশুরা আমাকে দেখে বিশ্বাস করবে যে তারাও একদিন এই মঞ্চে পৌঁছাতে পারে। আমি যদি পারি, তাহলে তারা কেন পারবে না?"
ইরাকের সামনে এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ। গ্রুপ পর্বে তাদের পরবর্তী প্রতিপক্ষ ফ্রান্স এবং এরপর সেনেগাল। নকআউট পর্বে ওঠার সম্ভাবনা খুব বেশি না থাকলেও বিশ্বকাপে তাদের উপস্থিতিই অনেকের কাছেই বিস্ময়ের।








