জন্মশতবর্ষে মহানায়কের স্মৃতিচারণ, খেলার মাঠের উত্তমকুমার
বেঁচে থাকলে তাঁর বয়স হত ১০০ বছর। তিনি নেই ৪৬ বছর , অথচ আজও তিনি অমলিন বাঙালির হৃদয়ে। উত্তম কুমার আজও বাঙালির আবেগ, জীবনের আরাধ্য। এই কিংবদন্তির সঙ্গে খেলাধুলোর সম্পর্ক কেমন ছিল? সুঠাম ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মহানায়কের জীবন ছিল একজন ক্রীড়াবিদের মত। নিয়মিত ব্যায়াম সাঁতারের মধ্যেই থাকতেন।

এক্সট্রাটাইম ওয়েব ডেস্ক
বেঁচে থাকলে তাঁর বয়স হত ১০০ বছর। তিনি নেই ৪৬ বছর , অথচ আজও তিনি অমলিন বাঙালির হৃদয়ে। উত্তম কুমার আজও বাঙালির আবেগ, জীবনের আরাধ্য।
এই কিংবদন্তির সঙ্গে খেলাধুলোর সম্পর্ক কেমন ছিল? সুঠাম ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মহানায়কের জীবন ছিল একজন ক্রীড়াবিদের মত। নিয়মিত ব্যায়াম সাঁতারের মধ্যেই থাকতেন।
মহানায়ক উত্তম কুমার কলকাতার ভবানীপুর সুইমিং অ্যাসোসিয়েশনে (Bhowanipur Swimming Association) সাঁতার কাটতে যেতেন। তিনি হলিউডের বিখ্যাত সাঁতারু ও অভিনেতা জনি ওয়াইসমুলারের (Tarzan খ্যাত) প্রচণ্ড ভক্ত ছিলেন এবং তাঁর মতোই চমৎকার সাঁতার কাটতেন।
অভিনয় জগতে আসার আগে তিনি এই ক্লাবের একজন তুখোড় সাঁতারু ছিলেন। ভবানীপুর সুইমিং অ্যাসোসিয়েশনে ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইল সাঁতার প্রতিযোগিতায় তিনি টানা তিন বছর চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। রুপালি পর্দার রোমান্টিক নায়ক হওয়ার অনেক আগেই তাঁর এই অ্যাথলেটিক বা খেলোয়াড়সুলভ সুঠাম শরীর তৈরি হয়েছিল এই সাঁতারের মাধ্যমেই। পরবর্তী জীবনেও তিনি তাঁর শরীর ও ফিটনেস ধরে রাখতে সাঁতারকেই বেছে নিয়েছিলেন।
মহানায়ক ফুটবলে প্রচণ্ড মোহনবাগান ভক্ত ছিলেন, মোহনবাগানের ম্যাচ থাকলে খবর নিতেন। অথচ সিনেমার প্রয়োজনে তাঁকে ইস্টবেঙ্গলের জার্সিও পরতে হয়েছিল। নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে। ‘সপ্তপদী’ ছবির ফুটবল দৃশ্যে ইস্টবেঙ্গলের জার্সি পরে তাঁকে খেলতে হয়েছিল। গল্পটি অসাধারণ। ফুটবল ম্যাচের শুটিং ছিল ইস্টবেঙ্গল মাঠে। বসুশ্রী সিনেমার মালিক মন্টু বসু তখন ইস্টবেঙ্গল কর্তা , তিনিই এই ব্যবস্থাপনা করেছেন। ফ্লোর রেডি কিন্তু জার্সি এসে পৌঁছায়নি, আরেক অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন বলেছেন, বেশি দেরি হলে তিনি থাকবেন না। তখন কর্তা মন্টু বসু প্রস্তাব দিলেন ক্লাবেই ইস্টবেঙ্গল জার্সি আছে, এটা পরেই শুটিং হতে পারে। ইস্টবেঙ্গল জার্সি দেখে পরতে অস্বীকার করেন উত্তম কুমার। কিন্তু বেঁকে বিশেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ইস্টবেঙ্গল জার্সি পরেই মাঠে নামেন মহানায়ক। পরবর্তী কালে শোনা যায়, সুচিত্রা সেনের কোনও ব্যস্ততা ছিলনা। সুচিত্রা সেন ছিলেন পূর্ববঙ্গীয় , ইস্টবেঙ্গল সমর্থক। মহানায়ক ছিলেন মোহনবাগান। ইস্টবেঙ্গল জার্সি পরাতেই এই চাতুরী করেছিলেন সুচিত্রা সেন!
ফুটবলপ্রেমীদের কাছে আলোচনার বিষয় সেদিনের সেই কাহিনি। এমনকি সেই দৃশ্যে তাঁর ফুটবল খেলার স্টাইল নিয়েও যথেষ্ট চর্চা হয়েছে।
আর তারপর আসে ‘ধন্যি মেয়ে’। ছবির গল্প। এই সিনেমায়, বিখ্যাত হাড়ভাঙ্গা ন্যাংটেশ্বর স্মৃতি শিল্ডের ফাইনাল ম্যাচের ধারাভাষ্য দিতে গাছে চড়েছিলেন সুখেন দাস, তেমনি গাছে চড়তে হয়েছিল গেছো মেয়ে মনসা অর্থাৎ জয়া ভাদুড়ী কে। যেমন গ্রামবাংলার মাটি, ফুটবল আর মানুষের হাসি-কান্না মিশে আছে, তেমনই ছবির শুটিংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হাওড়ার জগৎবল্লভপুরের গোয়াল পোঁতার এই মাঠের পাশের গাছ। এক বাস্তব তেঁতুল গাছ। সেই গাছের গায়ে মই ঠেকিয়ে জয়া ভাদুড়িকে উঠতে হয়েছিল শুটিংয়ের প্রয়োজনে। আজও গাছটি দাঁড়িয়ে আছে। অর্ধশতাব্দী অতিক্রম করেও।
একটা গাছ শুধু গাছ থাকে না। তার ছায়ায় জমে থাকে সময়ের গল্প। সেই তেঁতুল গাছও যেন উত্তম কুমারের এক অদৃশ্য স্মৃতিস্তম্ভ যেখানে সিনেমার আলো, গ্রামের মাটির গন্ধ আর মহানায়কের উপস্থিতি আজও মিশে আছে।
১১ ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯, ১৯৭৮ সালের বন্যার পর, মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল গঠনের জন্যে আয়োজিত ক্রিকেট ম্যাচের জন্যে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন মহানায়ক। বোম্বের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বনাম টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি । বম্বে দলে দিলীপ কুমারের নেতৃত্বে খেলেন অমিতাভ বচ্চন, জিতেন্দ্র, বিনোদ খান্নারা, আর কলকাতার নেতা উত্তম কুমার সহ গোটা দল। সেও আজ ইতিহাস।
মহানায়কের জন্মশতবর্ষে এই স্মৃতিচারণ আমাদের নিবেদন।
