ট্র্যাজেডিকে হারিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে: আয়মেন হুসেইনের অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প
ইরাকের ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের অন্যতম নায়ক আয়মেন হুসেইন। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে বলিভিয়ার বিপক্ষে জয়সূচক গোল করে তিনি ইরাককে ৪০ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে পৌঁছে দেন। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক হৃদয়বিদারক সংগ্রামের গল্প, যা তাকে আজকের জায়গায় নিয়ে এসেছে।

ইরাকের ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের অন্যতম নায়ক আয়মেন হুসেইন। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে বলিভিয়ার বিপক্ষে জয়সূচক গোল করে তিনি ইরাককে ৪০ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে পৌঁছে দেন। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক হৃদয়বিদারক সংগ্রামের গল্প, যা তাকে আজকের জায়গায় নিয়ে এসেছে।
মাত্র ১২ বছর বয়সে স্থানীয় একটি দলের হয়ে ফুটবল খেলতে শুরু করেছিলেন আয়মেন। তখনই তার জীবনে নেমে আসে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। নতুন বাড়ি নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে গিয়েছিলেন তাঁর বাবা। তখনই নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তাঁকে।
সেই ভয়াবহ দিনের কথা স্মরণ করে আয়মেন বলেন,
“প্রথমে আমরা বিশ্বাসই করতে পারিনি। পরে হাসপাতালে গিয়ে বাবার নিথর দেহ দেখতে পাই। এটি ছিল আমাদের পরিবারের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয়।”
বাবার মৃত্যুর ক্ষত কাটিয়ে ওঠার আগেই আরও একটি দুঃসংবাদ আসে। বড় ভাই, যিনি পরে ইরাকি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন, একসময় অপহৃত হন। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত তার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে একসময় ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আয়মেন। কিন্তু তার মা সেই সিদ্ধান্ত মানতে রাজি হননি।
আয়মেন বলেন,
“আমি ফুটবল ছেড়ে পরিবারের দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মা আমাকে থামিয়ে দেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এটাই তোমার স্বপ্ন। তোমাকে তা পূরণ করতেই হবে।’”
মায়ের সেই কথাই তাকে নতুন করে লড়াইয়ের শক্তি জুগিয়েছিল।
বাবার মৃত্যুর পর আয়মেন পরিবারকে নিয়ে অন্যত্র চলে যেতে চাইলেও বড় ভাই রাজি হননি। এদিকে তিনি ইরাক যুব দলের হয়ে খেলা শুরু করেন।
তুরস্কে একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে ফেরার পর তিনি জানতে পারেন, তার বড় ভাই নিখোঁজ হয়েছেন।
আয়মেন বলেন,
“তারপর থেকে আমরা আর কোনও খবর পাইনি।”
২০১২ সালে তাঁর জীবনের বড় মোড় আসে। ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের সেরা ক্লাব দোহুক তাকে দলে নেয়। ১ কোটি ৮০ লাখ ইরাকি দিনার (প্রায় ১৪ হাজার মার্কিন ডলার) এবং মাসিক ১২ লাখ দিনার বেতনের চুক্তি করেন তিনি।
তবে অর্থ নয়, তার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল স্বপ্নপূরণ।
তিনি বলেন,
“সত্যি বলতে আমি বিনা পারিশ্রমিকেও খেলতে রাজি ছিলাম। তখন জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে একই দলে খেলার সুযোগ পাওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল।”
দোহুকে দেড় বছর কাটানোর পর তিনি বাগদাদে চলে যান। আল-শোরতা, আল-তালাবা এবং আল-জাওরার মতো ক্লাবের হয়ে খেলেন। একাধিকবার লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হন।
পরে কাতারের আল খোর ক্লাবে যোগ দেন। এরপর আবার ইরাকে ফিরে আল কারমা ক্লাবে নাম লেখান।
প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলারের চুক্তিতে তিনি বর্তমানে ইরাকের সবচেয়ে দামি ফুটবলার হিসেবে পরিচিত।
সব অর্জনের মধ্যেও বাবা ও ভাইয়ের স্মৃতি তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়।
আয়মেন বলেন,
“আমি সবসময় চাইতাম, বাবা ও ভাই বেঁচে থাকলে আমার এই সাফল্য দেখতে পারতেন এবং আনন্দ ভাগ করে নিতে পারতেন।”
তার ক্যারিয়ারের কয়েকটি স্মরণীয় মুহূর্তের মধ্যে রয়েছে—
২০১৬ সালে কাতারের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ গোল করে ইরাককে রিও অলিম্পিকের টিকিট এনে দেওয়া।
২০২৩ সালে আরবিয়ান গালফ কাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া এবং দলকে শিরোপা জেতানো।
২০২৪ সালে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে গোল করে ইরাককে প্যারিস অলিম্পিকে পৌঁছে দেওয়া।
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে বলিভিয়ার বিপক্ষে জয়সূচক গোল করে ৪০ বছর পর ইরাককে বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরিয়ে আনা।
ইরাক জাতীয় দলের গোলরক্ষক ও সহ-অধিনায়ক জালাল হাসান মনে করেন, আয়মেন দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।
তিনি বলেন,
“আয়মেন এমন একটি নাম, যার পরিচয়ের প্রয়োজন নেই। তার পারফরম্যান্সই তার পরিচয়। বিশ্বকাপে দলকে এগিয়ে নিতে আমরা তার ওপর অনেক আশা রাখছি।”
ইরাকের সাবেক অধিনায়ক ও সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হুসেইন সাঈদও একই মত পোষণ করেন।
তার কথায়,
“আয়মেনের প্রভাব পুরো দলের ওপর স্পষ্ট। মাঠের বাইরে তিনি অত্যন্ত বিনয়ী ও ভালো মানুষ। আমি আশা করি, তার নেতৃত্ব দলকে গ্রুপ পর্বের গণ্ডি পেরিয়ে আরও দূরে নিয়ে যাবে।”
বিশ্বকাপের মঞ্চে ইরাকের সামনে থাকবে কঠিন চ্যালেঞ্জ। তবে কোটি কোটি ইরাকি সমর্থকের বিশ্বাস, সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে উঠে আসা আয়মেন হুসেইন আবারও দলের ত্রাতা হয়ে উঠতে পারেন।
যে ছেলেটি একসময় বাবাকে হারিয়েছে, ভাইকে হারিয়েছে, ফুটবল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল— সেই আয়মেন আজ বিশ্বকাপের স্বপ্নপূরণের প্রতীক। তার গল্প শুধু একজন ফুটবলারের সাফল্যের গল্প নয়; এটি সাহস, অধ্যবসায় এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য উদাহরণ।








